বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা শনাক্তকরণঃ








বুদ্ধি প্রতিবন্ধী অর্থ হল বয়স অনুযায়ী একটি শিশুর যে বুদ্ধি থাকার দরকার তার তুলনায় কম হওয়া বা কম থাকা। সাধারণত যাদের আই.কিউ(IQ) 70 নিচে থাকে তাদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
American Association for Mental Retardation, 1992) মতে কোন শিশুকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে বিবেচনা করতে নিচের চারটি Dimension শিশুর স্কোর কম(low) আসতে হবে। তাহলে তাকেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হিসেবে ধরা হবে।
1. Dimension I: Low intellectual functioning/low IQ and low adaptive functioning skills: আই কিউ(IQ) ৭০ নিচে হতে হবে এবং দুইটা বা তার বেশি adaptive skill areasসমস্যা থাকবে। এই গুলো ১৮ বয়সের পূর্বেই দেখা দিবে। ১৮ বয়সের পরে হবে হবে না।
2. Dimension II: Psychological and emotional status: ব্যক্তির Psychological and emotional দক্ষতা গুলো পরিমাপ করতে হবে adaptive behavior scales এর মাধ্যমে Psychological and emotional দক্ষতা গুলো strengths and weaknesses পরিমাপ করতে হবে। যদি Psychological and emotional দক্ষতা গুলো সবগুলো যদি weaknesses আসে তাহলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভবনা বেশি।
3. Dimension III: Physical health and aetiological factors:শিশুর শারিরিক স্বাস্থ্যের যথাযথ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে এবং তার কারণ গুলো খুজে বের করে ঠিক করা হবে আসলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কি না।
4. Dimension IV: Environmental factors: শিশুর বাসার পরিবেশ ও স্কুলের পরিবেশ ভাল ভাবে বিেশ্নষণ করতে হবে। স্কুলে performance কেমন করছে তা দেখতে হবে। যদি খারাপ মার্ক সব বিষয় গুলতে পায় বা ফেল করে বা যোগ, বিযোগ, গুন, ভা্‌গ করতে সমস্যা হয় বা পড়া ভুলে যায় বা মনে রাখতে পারে না ইত্যাদি বিষয় গুলো বিবেচনা করে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নির্ধরণ করতে হবে। পাশাপাশি শিশুর সামাজিক দক্ষতাগুলো পরিমাপ করতে হবে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর লক্ষণ/ symptoms :
সাধারণত কয়েকটি সাইকোলজিক্যাল ডোমেনে লক্ষণ গুলো দেখা দেয় । যেমন-
1.Deficits in Intellectual Functions:
1.ভাষা বিকাশে সমস্যা/Language develop
2.যৌক্তিক চিন্তা করতে সমস্য
3.সমস্যা সমাধান করতে সমস্যা/ Problem solving
4.পরিকল্পনা করতে সমস্যা/ Planning
5.Abstract thinking করতে পারে না।
6.Judgment সমস্যা হয়
7.পড়াশুনায় সমস্যা হয়/ Academic learning
8.অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষতে পারে না/Learning from experience
2.Deficits in Adaptive Functioning :
1.নিজে থেকে নির্ভরশীল(social responsibility) হতে পারে না এবং সামাজিক নিয়ম কানুন বা দায়িত্ব(social responsibility) নিতে সমস্যা হয়/
2.দৈনন্দিন কাজ কর্ম করতে সমস্যা হয় যেমন- communication, social participation, community use, functional academics, health and safety, leisure, self-care, self- direction, independent living, across settings–in the home, school, work, and community.
3.Conceptual Domain:
1.কথা বলতে দেরিতে শিখে বা প্রশ্ন করলে দেরিতে উত্তর দেয়।
2. Pre-academic দক্ষতা গুলো দেরিতে শিখে বা শিখতে বিলম্ব হয়।
3.লিখতে, পড়তে ও অংক করতে বা গাণিতিক সংকেত শিখতে সমস্যা বা বিলম্ব হয়। Phonology, morphology and syntax, semantics, and pragmatics এই সবে সমস্যা হয়।
4.সময়ের হিসাব (দিন মাস, তারিখ, সপ্তাহ, কয়টা বাজে) ও টাকার হিসাব বুঝতে পারে না। যেমন – টাকা দিয়ে বাজার করতে দিলে দোকানদারকে কত টাকা দিতে হবে আর কত টাকা ফেরত নিতে হবে তা বুঝতে পারে না।
5.abstract thinking করতে সমস্যা হয়। যেমন- অনেকে মনে মনে সমস্যা সমাধান করে থাকে কিন্তু এইসব শিশু পারে না। (concrete approach to problem solving)
6.executive function সমস্যা হয় যেমন- planning, strategizing, priority setting, cognitive flexibility ইত্যাদি।
7.কোনো নির্দেশনা সহজে বুঝতে পারে না। একই নির্দেশনা বারবার দিতে হয়।
8.short-term memory তে সমস্যা হ্য়। আমারা জানি short-term immediate কাজ বা কথা বলার জন্য ব্যবহার করা হয়। যার কারনে অনেক সময় ভুলে যায় অন্যরা কি বলছে বা প্রশ্ন করছে তার উত্তর দিতে পারে না।
9.money management and time management সমস্যা হয়।
4. Social Domain:
1.Limitations in language and communication skills
2.কঠিন/জটিল শব্দ বা বাক্য বুঝতে পারে না। কম জটিল শব্দ বা ভাষা বা এক দুই কথায় অন্যের সাথে কথা বলে।
3.বেশি শব্দ বলতে পারে না এবং ভাষার ব্যাকারণের প্রয়োগ ভুল হয়।
4.অন্যের সাথে কথা বলার সময় nonspoken/non-verbal সংকেত ব্যবহার করে। যেমন- gestures, signs, facial expressions, and other forms of augmentative and alternative communication
5.অপরিণত সামাজিক বিচার (social judgment) and সিদ্ধান্ত নিতে(decision making) সমস্যা হয়।
6.খেলার নিয়ম কানুন বা সামাজিক নিয়ম কানুন বুঝতে সমস্যা হয় বা পারে না( peer social cues and social rules)
7.সঠিক ভাবে আবেগের প্রকাশ ও আচরণের প্রকাশ করতে সমস্যা হয়।
5.Practical Domain:
1.Daily life activities এ অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয় যেমন-
2.নিজের যত্ন নিতে সমস্যা( Personal care)
3.জটিল কাজ(Complex tasks) যেমন- shopping, transportation, care organization,meals, money management
4.Employment
5.Health care and legal decisions
6.Household tasks
7.Recreational skills
বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা শনাক্তকরণঃ
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নির্ধারনের জন্য অবশ্যই বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) করতে হবে। বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) ছাড়া কখনো বুদ্ধি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শনাক্ত করা যায় না। তাই উপরের লক্ষণ গুলো আপনার সন্তানের মধ্যে দেখলেই বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) করে দেখতে পারেন আসলেই তার বুদ্ধির সমস্যা না অন্য কিছু সমস্যা আছে। বুদ্ধির পরীক্ষায়(IQ Test) সাধারণত স্মৃতিশক্তি (Short term memory), শব্দের ব্যবহার (Vocabulary), নৈব্যক্তিক যুক্তি (Abstract Reasoning) , সাধারন তথ্য (General Information), গানিতিক যুক্তি (Numerical Reasoning) ইত্যাদি বিষয় গুলো পরীক্ষা করে দেখা হয়। সাধারণত একটি পরীক্ষা করতে ২-৩ ঘণ্টা সময় লাগে বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
যিনি বুদ্ধি পরীক্ষা করবেন তিনাকে অবশই শিশুর বিকশ পর্যায় ও শিশু বিকাশের তত্ব গুলো খুব ভাল ভাবে জানতে হবে। তাই দক্ষ চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর(clinical psychologist) কাছ থেকে বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) করাতে হবে। কম দক্ষতা বা কম জ্ঞান সম্পূর্ণ হলে অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধি (IQ) ভুল বা কম চলে আসতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) করার ধরণের উপর বুদ্ধি কম বা বেশি হতে পারে। তাই বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) সময় খুব সচেতন থাকতে হবে। কারণ বুদ্ধির পরীক্ষা(IQ Test) একটি শিশুর ভবিষ্যৎ অনেক কিছু নির্ভর করে।
wechsler বুদ্ধি অভীক্ষা অনুযায়ী বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতার স্তরঃ-
১। Mild Intellectual Disability/মৃদু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী: এদের বুদ্ধাঙ্ক(IQ) গড়ে ৭০-৫০ হয়। বিশেষ যত্ন নিলে এরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তবে বেশি দূর করতে পারে না।
২। Moderate Intellectual Disability/মধ্যম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী: এদের বুদ্ধাঙ্ক(IQ) গড়ে ৪৯-৩৫ হয়। এই ধরনের প্রতিবন্ধী শিশুদের অনেকের ডাউন সিন্ডোম থাকে। অনেকের শারীরিক বৈকল্যও থাকতে পারে।
৩। Severe Intellectual Disability/গুরুতর মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী: এদের বুদ্ধাঙ্ক(IQ) ৩৪-২০। এদের জন্মগ্রহণের পরপরই শনাক্ত করা যায়।
৪। Profound Intellectual Disability/চরম মাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধী: এদের বুদ্ধাঙ্ক(IQ) ২০ এর কম। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিশুর শারীরিক ও অন্যান্য বৈকল্য থাকতে পারে।
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কারণ/Causes: বিভিন্ন কারণে একটি শিশু প্রতিবন্ধী হতে পারে। যেমন-
1.বংশগত কারণঃ বংশগত বা জেনেটিক কারণেও ব্যক্তির মাঝে মানসিক প্রতিবন্ধীত্ দেখা দিয়ে থাকে৷
2. Prenatal/জন্মের পূর্বকালীনকারণগুলো হচ্ছে -
(ক) মা গর্ভাবস্থায় রোগে আক্রান্ত হলে
(খ) মায়ের অপুষ্টি জনিত
(গ) গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ঔষধ গ্রহণ
(ঘ) মায়ের বয়সঃ গর্ভধারনের সময় মায়ের বয়স কম বা বেশি দুটিই শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকি পূর্ণ।
(ঙ) ঘণ ঘণ খিঁচুনি
(চ) নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিবাহ
(ছ) তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রবেশ
(জ) মা বাবার রক্তের Rh উপাদান
3. Perinata/ শিশু জন্মের সময়ের কারণসমূহঃ-
(ক) Anoxia at birth বা শিশুর জন্ম সময়কাল দীর্ঘ হলে, শিশুর গলায় নাড়ি পেচানোর কারণে বা শিশু জন্মের পর পরই শ্বাস নিতে অক্ষম হলে
(খ) জন্মের সময় মস্তিস্কে কোনো আঘাত
4. Postnatal/শিশু জন্মের পরবর্তী কারণসমূহঃ-
(ক) Infections বা রোগে আক্রান্ত হলে যেমন – জন্ডিস, ডাইরিয়া, নিউমোনিয়া ইত্যাদি।
(খ) Traumatic brain injuryঃ শৈশবে পরে গিয়ে মস্তিস্কে আঘাত পায় বা শারিরীক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় ।
(গ) Toxic metabolic syndromes and intoxication: পরিবেশের বিষাক্ত পদার্থ, যেমন- পোকা মাকর ধ্বংস করার রাসায়নিক পদার্থ, ফ্লোরাইড, আর্সেনিক মিশ্রিত পানি ইত্যাদি শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
(ঘ) malnutrition: পুষ্টিকর উপাদানের অভাবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যহত হয় এবং শিশু মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী হতে পারে।
চিকিৎসাঃ
1.Medicine (by psychiatrist)
2.Cognitive behavior therapy(by clinical psychologist)
3.Cognitive Stimulation Therapy(by Neuropsychologist /clinical psychologist)
4.Social skills training
5.Behavioral and communication skills training
6.Family counseling
7.Parental counseling
দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে বুদ্ধি কখনো বাড়ে না। তাই বুদ্ধি পরীক্ষায়(IQ Test) বুদ্ধি যদি কারো কম চলে আসে বা কম বুদ্ধি পাওয়া যায় তাহলে কোন ভাবেই আর বুদ্ধি বাড়ানো যায় না।
তবে জীবন ধারণের জন্য Training বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শিখানো যায়- যেমন-
১। দাঁত মাজা, কাপড়-চোপড় পড়া, গোসল করা, Toilet করা শিখাতে হবে।
২। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাজার করা, টাকা গোনা, হিসাব-নিকাশ করা শিখাতে হবে।
৩। লেখাপড়ায় বেশি এগুতে না পারলেও সহজ কোনো কাজ শিখাতে হবে। যেটাকে সে একা বা কারও সুপারভিশনে পেশা হিসেবে নিতে হবে।
৪। শিশুকে শারীরিক নির্যাতন করবেন না। এটা কোনো সমাধান নয়।
৫।মা-বাবারও কাউন্সিলিং নিতে হবে। আপনার ধৈর্য অবশ্যই বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি চেষ্টা সফলতা বয়ে আনতে পারে।
৬। ওষুধ দিয়ে শিশুর বুদ্ধি চিকিৎসা এখনও সন্তোষজনক নয়।
৭। তাই মস্তিষ্ককে বেশি বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে এমন আচরণ যতবেশি ব্যবহার করবে ব্রেইন কর্ম দক্ষতা(Activities) তত বাড়বে। তাই ওষুধের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল সাইকলজিস্ট বা নিরোসাকোলজিস্টের কাছ থেকে cognitive behavior therapy বা Cognitive Stimulation Therapy নিতে হবে। এতে অবস্থার কিছুটা হলেও উন্নতি হবে।
আপনাদের যেকোন মানসিক সমস্যা সংক্রান্ত প্রশ্ন আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন অথবা যদি গোপনীয়তা চান তাহলে এই পেজের messenger e message করতে পারেন। ধন্যবাদ
মো:আব্দুল কাদির সুজন
মনোবিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম কলেজ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আপনি কার জন্য প্রিয় হবেন ?